বাসস্ট্যান্ডের সেই বিকেলটা আজও আমার ভেতরে ধোঁয়ার মতো ভাসে। আকাশে মেঘ, নরম রোদ, চারদিকে মানুষের ভিড়, বাসের হর্ণ, কন্ডাক্টরের চিৎকার, সবকিছুই স্বাভাবিক চলছে অথচ আমাদের দু’জনের জন্য সময়টা অদ্ভুতভাবে থেমে গিয়েছিল, অদ্ভুত এক নীরবতা ছিল।
চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে গরম, চিনি ছাড়া চা। তেতো, অদ্ভুত, তবু এক ধরনের শান্ত কিন্তু অস্থির অনুভূতি। হাতে সিগারেট! তুমি কিছু বললে না অবাকও হলে না, হয়ত আর কোন কিছু যায় আসে না! আমি সাধারণত সিগারেট খাই না কিন্তু কিছু কিছু মুহূর্ত আসে, যখন ভেতরের অস্থিরতা এতটাই বেড়ে যায় যে নিজের অজান্তেই কহন কখনো ধরিয়ে ফেলি, আজ ঠিক তেমনই একটা দিন।
তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলে, আমার সাথে, কিন্তু চোখ দুটো যেন অন্য কোথাও। কথাগুলো তোমার ঠোঁট ছুঁয়ে ফিরে যাচ্ছিল। অদৃশ্য দূরত্ব কি তখন বুঝতে পারছিলাম…
এই নীরবতার ভেতরে তোমার সিদ্ধান্ত লুকিয়ে। তুমি চলে যাচ্ছ এই শহর ছেড়ে, আমাকে ছেড়ে…
“তুমি যেতে চাইলে যাও… কোনো দরকার হলে অন্তত জানিও। যোগাযোগটা রেখো।”
কথাটা বলার সময় নিজেকে খুব শক্ত মনে হচ্ছিল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যেন কিছু ভেঙে পড়ছিল। এটা কি সত্যিই তোমাকে যাওয়ার অনুমতি ছিল? নাকি এক নিঃশব্দ অনুরোধ, তুমি থেকে যাও?
তুমি কিছু বললে না। শুধু একবার তাকালে, যেন অনেক কথা বলতে চাও, কিন্তু ভাষা খুঁজে পাচ্ছো না। সেই চোখের ভেতরে আমি দ্বিধা দেখেছিলাম, লুকোনো ব্যথা, অবহেলায় সিক্ত কিছু অনুভূতি।
আর কিছু বলার সাহস করিনি
আমাদের সম্পর্কটা কখনো বড় কোনো ঝগড়ায় ভাঙেনি। ভালোবাসার অভাবে নয়, কোনো তৃতীয় মানুষের আগমনে নয় বরং ছোট ছোট অভিমান, অজানা দূরত্ব আর না বলা কথার ভেতরেই ধীরে ধীরে ফাঁক তৈরি হয়েছিল। আমরা দু’জনেই জানতাম, কোথাও একটা ভুল হচ্ছে কিন্তু কেউই ঠিক করে বলতে পারছিলাম না, কী সেই ভুল।
আমি ধীর গলায়.
“যাওয়ার আগে… একবার জড়িয়ে ধরবে?”
তুমি একটু থেমে গেলে, তারপর এগিয়ে এলে। সেই আলিঙ্গনটা ছিল নিঃশব্দ, কিন্তু তাতে হাজারটা কথা ছিল। সেখানে ছিল ভালোবাসা, অভিমান, হারিয়ে যাওয়ার ভয় আর ছিল এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা, যা বলে দিচ্ছিল, হয়তো এটাই শেষ।
তোমার কাঁধে মুখ রেখে আমি ভাবছিলাম এই মুহূর্তটা যদি থেমে যেত! যদি সময়টা আর না এগোতো! কিন্তু হায় জীবন আর বাস্তবতা কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না।
তুমি ধীরে ধীরে সরে গেলে। আমি দেখলাম, তোমার চোখেও কিছু জমে আছে হয়তো জল, হয়তো না বলা কথা, হয়তো না দেখানো হাজারো অভিমান।
আমি থেমে গেলাম, তারপর বললাম, – “যদি তোমার অহংকার ভেঙে যায়, বা ভালোবাসাটা আবার ফিরে আসে… জানিও ……
তুমি হালকা করে মাথা নাড়লে। কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে না, কোনো নিশ্চয়তাও না। শুধু সেই চেনা নীরবতা।
বাস ছেড়ে দিল। তুমি উঠে গেলে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম, যতক্ষণ না তোমাকে আর দেখা যায়।
সেদিনের পর অনেক সময় কেটে গেছে। জীবন তার নিজের মতো এগিয়ে গেছে। নতুন মানুষ এসেছে, নতুন গল্প তৈরি হয়েছে। তবুও, কিছু মুহূর্ত আছে যেগুলো সময়ের ভিড়েও হারিয়ে যায় না।
মাঝে মাঝে মনে হয় তুমিও কি কখনো ভাবো, সেই শেষ আলিঙ্গনের কথা?
কখনো কি মনে হয়েছে একটু থেমে গেলে হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতে পারত?
আমি আজও জানি না, আমাদের গল্পটা শেষ হয়েছিল, নাকি শুধু থেমে গিয়েছিল। হয়তো কিছু গল্প শেষ হয় না শুধু নির্দিষ্ট এক মুহূর্তে গিয়ে আটকে থাকে সমাপ্তির অপেক্ষায়!
জীবন এখনও সেই চিনি ছাড়া চায়ের মতই রয়ে গেছে…
আমার জন্য, সেই মুহূর্তটা এখনও সেই বাসস্ট্যান্ডেই দাঁড়িয়ে আছে
যেখানে তুমি চলে যাচ্ছিলে, আর আমি…
শেষবারের মতো তোমাকে জড়িয়ে ধরে, নীরবে অপেক্ষা করছিলাম
হয়তো তুমি ফিরে তাকাবে……

